বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলা শহরের হৃদয়ে বয়ে যাওয়া সেই প্রাচীন জেলখানার খাল যে খাল একদিন শহরের প্রাণ ছিল, মানুষের নিত্যদিনের ভরসা ছিল আজ যেন ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা এক নিঃশ্বাসহীন জলরেখা। দখলদারদের লোভ, প্রশাসনের উদাসীনতা, আর অব্যবস্থাপনার দীর্ঘ ছায়া খালটিকে করে তুলেছে প্রায় অচেনা। যে খাল একদিন তুলাতলা নদী আর শ্রীমন্ত নদীর বুক ছুঁয়ে সদর রোডের মাঝ বরাবর প্রবাহিত হতো, আজ সেখানে জমেছে ময়লা, আবর্জনা আর বেআইনি স্থাপনার অগণিত স্তূপ।
কখনো এই খালের জলে ভেসে যেত মানুষের হাসিখুশি নদীর সুর। দু’পাড়ের পরিবারগুলো গোসল থেকে রান্না সব কাজেই ভরসা করত এই জলের ওপর। ব্যবসায়ীরা নৌকা ভরে পণ্য নিয়ে দূরদূরান্তে যেতেন। শহরের অর্থনীতি, জীবনযাত্রা সবকিছুর স্রোত যেন এই খালের জলেই লুকিয়ে ছিল।
কিন্তু ২০১৪ সালের পর চিত্রটা পাল্টে যায়। জেলা পরিষদের সরকারি খালের বুকে পৌরসভার ড্রেন নির্মাণের পর খালের ওই অংশ দখলের উৎসব শুরু হয়। সদর রোডজুড়ে একের পর এক গজিয়ে ওঠে দোকানপাট, মার্কেট, স্থায়ী ভবন। দিনের পর দিন মাটি আর আবর্জনা ফেলে খাল ভরাট হতে থাকে। একসময়ের প্রমত্তা খাল আজ মৃতপ্রায়; পানি প্রবাহ থেমে গেছে বহু আগেই, বর্ষায় শহর ডুবে যায় জলাবদ্ধতায়, আর বাতাস ভরে ওঠে দূষণের তীব্র দুর্গন্ধে।
সদর রোডের ওপর খন্দকার বস্ত্রালয়ের ছাদে এখন নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজও প্রায় শেষ। সরকারি খালের ওপর এমন প্রকাশ্য দখলদারত্বেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় মানুষের মাঝে হতাশা আর ক্ষোভ দুটোই জমেছে। দোকানের মালিক আব্দুল বারেক হাওলাদার দাবি করেন তিনি নাকি ১৯৮৪ সালেই জমিটি কিনেছেন। কিন্তু আইনি নথি দেখাতে গেলে তাঁর নীরবতা সব প্রশ্নকে আরও বেশি স্পষ্ট করে তোলে।
খালের উৎসমুখ থেকে বাকেরগঞ্জ কলেজের পেছন পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে এখন কেবলই দখল আর লোভের অচেনা শহর। পাকা আধাপাকা দোকানপাট, ব্যক্তিগত সড়ক, এমনকি পৌরসভার তত্ত্বাবধানে নির্মিত মসজিদের নাম ভর করে গড়ে ওঠা শপিংমল সবই যেন সরকারি সম্পত্তি গ্রাসের প্রতিযোগিতা।
অথচ এই খালই ছিল বর্ষার পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম। খাল বেঁচে থাকলে বাঁচত শহর; আজ সেই খাল মৃতপ্রায়, আর শহরের মানুষ জলাবদ্ধতা, দুষণ আর রোগব্যাধির বোঝা বইছে বছরের পর বছর। স্থানীয় বাসিন্দা শেখ মাহমুদুর রহমান রিমনের ভাষায় দখলদারত্ব শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, আর এখন তা যেন সীমাহীন রূপ নিয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন খাল উদ্ধারে প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এলাকাবাসী বৃহত্তর আন্দোলনে নামবে।
এদিকে পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ জানিয়েছেন খালটি তিনি সরেজমিনে দেখেছেন, চলমান নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়েছে, এসিল্যান্ডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দ্রুত রেকর্ডভুক্ত জমি চিহ্নিত করতে। খুব শীঘ্রই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
বাকেরগঞ্জবাসীর একটাই চাওয়া দখলমুক্ত, খননকৃত, স্বাভাবিক প্রবাহময় সেই পুরোনো খালের পুনর্জন্ম। যে খাল একদিন ছিল আশা, জীবন আর প্রকৃতির স্বস্তি সে খাল যেন আবার জেগে ওঠে নিজের স্বভূমিতে, নিজের জলে। খাল বাঁচলে শহর বাঁচবে এই ডাকই এখন মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা।