বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় শিশুদের সাঁতার প্রতিযোগিতা, র্যালিসহ বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবস উদযাপন করতে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য আসুন সবাই মিলে পানিতে ডুবে মৃত্যুস্রোত বদলে দেই।
২৩ জুলাই সকাল ১০ টায় উপজেলা পরিষদ হলরুম কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলটন চন্দ্র পাল।
এ সময় তিনি বলেন বরিশালে যেহেতু পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি, সেজন্য শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে বরিশালের বাকেরগঞ্জে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্ধারণ করায় সিআইপিআরবি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান। এ বছরের দিবসকে ধারণ করে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যত নিরাপদ করতে এবং অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে বলেও জানান উপজেলায় এই নির্বাহী কর্মকর্তা।
দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩৯ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। খাল-বিল, নদীনালা বেশি থাকায় বরিশাল বিভাগে পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকি দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে বেশি। অথচ শিশুদের প্রতি নজর রাখা ও তাদের সাঁতার শেখানোর মতো স্থানীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে এ ঝুঁকি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যু প্রতিরোধে সচেতনতাবৃ্দ্ধি ও তাদের সাঁতার শেখাতে তিনি সবাইকে একযোগে কাজ করার অনুরোধ করেন।
অনুষ্ঠানে সিআইপিআরবি-এর উপ-পরিচালক মোঃ আবুল বরকাত পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে নিরাপদে ভাসা প্রকল্পের কার্যক্রম, এবং প্রতিষ্ঠানটির জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাফল্য তুলে ধরেন। এছাড়াও তিনি, এ দিবসের প্রেক্ষপট ও এ দিবসের স্বীকৃতি পেতে বাংলাদেশ ও আয়ারল্যান্ডের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, অফিসার ইন-চার্জ (বাকেরগঞ্জ থানা), সমাজসেবা কর্মকর্তা, শিশু ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ প্রায় ১৩০ জন অংশগ্রহণ করেন। সবশেষে, অনুষ্ঠানে শিশুদের সাঁতার ও চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। এছাড়াও সিআইপিআরবি প্রধান কার্যালয থেকে অর্পনা ঘোষ, কমিউনিকেশন ম্যানেজার, মো: সেকান্দর আলী, সুইমসেফ স্পেশালিস্ট, তানজিনা আক্তার, ম্যানেজার, রিসোর্স মবিলাইজেশন এন্ড স্ট্রাটেজিক পার্টনারশিপ, সিআইপিআরবির আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মোতাহার হোসেন এবং সিআইপিআরবির বাকেরগঞ্জ অফিসের কর্মীবৃন্দ।
দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় ২৩ জুলাই সিআইপিআরবি বাকেরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের পুকুরে ১৮ জন বাছাইকৃত ছেলে ও মেয়ে শিশুদের নিয়ে একটি সাঁতার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে বাকেরগঞ্জ উপজেলার ৩টি ইউনিয়ন এবং পৌরসভার মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ২২০ জন শিক্ষার্থীদের আঁকা ছবির প্রদর্শনী করা হয়। এছাড়াও সকালে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, অভিভাবক, সাংবাদিক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে একটি সচেতনতামূলক র্যালির আয়োজন করা হয়।
উল্লেখ্য, সিআইপিআরবি শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে বাকেরগঞ্জে যুক্তরাজ্যের দাতা সংস্থা রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইন্সটিটিউশন (আরএনএলআই) এবং প্রিন্সেস শার্লিন অব মোনাকো ফাউন্ডেশন এর অর্থায়নে ২০১৬ সাল থেকে ভাসা ও নিরাপদে ভাসা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে সিআইপিআরবি এই উপজেলায় ৫০ টি আঁচল (শিশুযত্ন কেন্দ্র) পরিচালনার মাধ্যমে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১২৫০ জন শিশুকে পানিতে ডুবার হাত থেকে সুরক্ষা দিচেছ। একইভাবে প্রকল্পটির আওতায় গত ৭ বছরে প্রায় ১৪,০০০ শিশুকে সাঁতার শেখানো হয়েছে। চলতি বছর ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী ২,২০০ শিশুকে এ উপজেলায় সাঁতার শেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
উল্লেখ করা যায় যে, বাংলাদেশ হেলথ ও ইনজুরি সমীক্ষা ২০২৩ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিদিন ৩৯ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে ১ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এই মৃত্যুকে ‘নিরব মহামারী হিসাবে চিহ্নিত করা ও তা প্রতিরোধে বিশ্বব্যপী সচেতনতা বাড়াতে ২০২১ সাল থেকে ২৫ জুলাই বিশ্ব পানিতে ডুবা প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়। সিআইপিআরবি পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে ২০০৫ সাল থেকে বিভিন্ন দেশীয় প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে আসছে। গবেষণায় দেখা গেছে এক থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র ‘আঁচল’ পরিচালনার মাধ্যমে ৮২ শতাংশ শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়। অন্যদিকে ৬-১০ বছর বয়সী শিশুদের সাঁতার শিখিয়ে ৯৬ শতাংশ শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। এছাড়াও পানিতে ডুবে যাওয়া কাউকে উদ্ধারের পর সাথে সাথেই প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া গেলে মৃত্যু ও ইনজুরিজনিত ক্ষয়-ক্ষতি বহুলাংশে কমে যায়। পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে সিআইপিআরবি-এর উদ্যোগগুলো সরকারিভাবে ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থায় স্বীকৃতি পেয়েছে।